নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
নদীতীরবর্তী সরকারি জমি রাষ্ট্রের সম্পত্তি হলেও বরিশাল ও ঝালকাঠি জেলার বিভিন্ন এলাকায় এসব জমির বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালীদের দখলে রয়েছে—এমন অভিযোগ উঠেছে স্থানীয়দের পক্ষ থেকে। তাঁদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে নদীতীরবর্তী সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি দখল করে সেখানে শিল্পকারখানা, গুদাম ও স্থায়ী স্থাপনা গড়ে তোলা হয়।
অভিযোগের তালিকায় সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, মেয়র ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের নাম উঠে এসেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, ক্ষমতাসীনদের প্রভাবের কারণে সাধারণ মানুষ এতদিন এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে পারেননি।
ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার পশ্চিম চর দপদপিয়া ও তিমিরকাঠি মৌজায় নদীভাঙনের পর জেগে ওঠা অন্তত ২০ একর জমি দখলের অভিযোগ রয়েছে সাবেক শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমুর বিরুদ্ধে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এসব জমি নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে সেখানে অপসোনিন ফার্মা লিমিটেডের কারখানা স্থাপন করা হয়েছে।
ভুক্তভোগীদের দাবি অনুযায়ী, ২০০৭ সালে মৃত রুস্তম আলীর মালিকানাধীন ২৯৪ নম্বর দাগের জমির রেকর্ড ২০১৭ সালে ওয়ারিশদের জাল স্বাক্ষর ব্যবহার করে তহসিলদারের সহায়তায় সংশোধন করা হয়। পরে দালালচক্রের মাধ্যমে জমি ক্রয়-বিক্রয়ের কাগজপত্র তৈরি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি ২৭৫ নম্বর দাগের সিকস্তি জমি অপসোনিন ফার্মা লিমিটেডের নামে রেকর্ডভুক্ত করা হয়েছে। পশ্চিম চর দপদপিয়া মৌজার ৫৭২ নম্বর দাগের সরকারি জমির কোনো নথি এসিল্যান্ড অফিসে পাওয়া যায়নি বলেও জানান স্থানীয়রা, যদিও পুরো জমিটি বর্তমানে একটি প্রতিষ্ঠানের দখলে রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন দপদপিয়া ইউনিয়নের ভূমি সরকারি কর্মকর্তা (তহসিলদার) আব্দুল মালেক।
বরিশাল নগরীতেও নদীতীর দখলের অভিযোগ রয়েছে। ৩০ গোডাউন এলাকায় কীর্তনখোলা নদীর তীরে প্রায় এক একর জমি দখলের অভিযোগ উঠেছে সাবেক চিফ হুইপ আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহর বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, জমি উদ্ধারে মামলা করতে গেলে তাঁদের হুমকি দেওয়া হয় এবং একপর্যায়ে মামলা প্রত্যাহারে বাধ্য করা হয়।
এ ছাড়া বরিশাল শহরের চাঁদমারি থেকে দপদপিয়া পর্যন্ত নদীতীরবর্তী সরকারি জমি লিজের নামে দখলে রাখার অভিযোগ রয়েছে সাবেক মেয়র শওকত হোসেন হিরণের স্ত্রী ও সাবেক সংসদ সদস্য জেবুন্নেছা আফরোজ, সুরভী লঞ্চের মালিক গোলাম মাওলাসহ একাধিক প্রভাবশালীর বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের অভিযোগ, জল খাজনা পরিশোধ না করেই এসব জমি দীর্ঘদিন ভোগদখলে রাখা হয়েছে।
এ বিষয়ে বরিশালের জেলা প্রশাসক খায়রুল আলম সুমন বলেন, সরকারি বা ব্যক্তিমালিকানাধীন কোনো জমি অবৈধভাবে দখলের সুযোগ নেই। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই বক্তব্য দেন ঝালকাঠির জেলা প্রশাসক মমিনউদ্দিন।
উল্লেখ্য, ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সাবেক চিফ হুইপ আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ দেশের বাইরে আত্মগোপনে রয়েছেন। সাবেক শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু ও সাবেক সংসদ সদস্য জেবুন্নেছা আফরোজ বর্তমানে কারাগারে আছেন। সাবেক মেয়র শওকত হোসেন হিরণ ২০১৪ সালে মৃত্যুবরণ করেন। অভিযোগের বিষয়ে অপসোনিন ফার্মা লিমিটেডের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ভুক্তভোগীদের দাবি, নদীভাঙনের সুযোগে দখল হয়ে যাওয়া এসব জমি দ্রুত উদ্ধার করে রাষ্ট্রের মালিকানায় ফিরিয়ে আনা অথবা প্রকৃত মালিকদের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে প্রশাসনিক ও আইনি উদ্যোগ নেওয়া হোক।